
মুহুর্ত অনলাইন: সিরিয়ায় ক্ষমতা দখলকারী বিদ্রোহী গ্রুপ হায়াত তাহরীর আল শামের প্রতি প্রেসিডেন্ট রিসেব তাইয়েব এরদোয়ানের সমর্থন আঞ্চলিক শক্তির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তুরস্ককে নতুন এই পরিস্থিতি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকেও আঙ্কারার বৃত্তের মধ্যে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এরদোয়ানকে এই পরিবর্তনকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও আলোচনা থেকে জানা যায় সিরিয়ার ক্ষমতা এরদোয়ানে হাতে, সিরিয়ায় বাশার আল আছাদের সরকারের পতনে দেশটিতে ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানের অবসান ঘটেছে। একই সাথে সেখানে নতুন শক্তি হিসেবে উত্থান ঘটেছে তুরস্কের। এই পরিস্থিতি হর্ন অফ আফ্রিকা থেকে শুরু করে লেবানন এবং আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন করে সাজানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে, বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিস্ময়কর বিজয়ে মূল ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক। তাদের এই অভিযানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো ১২ দিনের এই বিজয় অভিযানে সহিংসতা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কোন ঘটনা ঘটেনি, যা সিরিয়ায় গত ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধে বরাবরই দেখা গেছে। বিদ্রোহীদের চূড়ান্ত বিজয়ের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য, দিক নির্দেশনা ও রাজনৈতিক ছায়া দিয়ে সহায়তা করেছে তুরস্ক।
সিরিয়ায় সংঘাত শুরু হওয়ার প্রথম কয়েক বছরে বিরোধী গ্রুপগুলোকে বিক্ষিপ্তভাবে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে অনেক দেশই, কিন্তু তুরস্ক তার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের কাছে থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সবসময় ধারাবাহিকভাবে সমর্থন দিয়ে এসেছে। কিন্তু ২০১৯ সালে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে অস্ত্রবিরতির পর তুরস্ক বিদ্রোহীদেরকে নতুন করে অস্ত্র দেওয়ার এবং তাদেরকে পুনরায় সংঘটিত করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে।
সিরিয়া এবং লেবাননে ইরান ও হিজবুল্লাহ নেটওয়ার্কে ইসরাইলের ব্যাপক হামলা দুই মিত্রের যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করেছে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আছাদের সমর্থনে সমরাষ্ট্র ও লোকবল সরবরাহ করা তাদের কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় রাশিয়ার পক্ষেও বাশারের জন্য তেমন কিছু করার সুযোগ ছিল না। বিদ্রোহীদের ঝটিকা অভিযান মোকাবেলা করার মনোবল হারিয়ে ফেলছিল সিরিয় সেনাবাহিনী। ফলে বাশার আল আছাদের সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।
বাশার আল আছাদের সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে তুরস্কের যে সাফল্য এসেছে, তার প্রভাব ইরাকেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই তুরস্কের উপস্থিতির কারণে এবং সেখানে কুর্দিদের সহায়তা নিয়ে পিকে গেরিলাদের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই অভিযান পরিচালনা করে আসছে তুর্কি সেনারা। সিরিয়ায় সুন্নিদের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার ফলে ইরাকের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে তুরস্কের অবস্থান শক্তিশালী হবে। ২০১৯ সালে ইরাকে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের আধিপত্যের অবসান ঘটার পর সেই অঞ্চলে ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদেরও কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায়। সিরিয়ার পর এখন ইরাকেও ইরানের প্রভাব কমবে এবং বাড়বে তুরস্কের প্রভাব। ফলে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে ক্রমান্বয়ে একটি পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেব তাইয়েব এরদোয়ান।
তুরস্কের নজর ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব যে কেবল সিরিয়া ও ইরাকে সীমাবদ্ধ থাকবে, তা ভাবার কোন কারণ নেই। উত্তর আফ্রিকা, ককেশিয়াস ও মধ্য এশিয়ার দিকেও চোখ রয়েছে এরদোয়ানের। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিজয়ের চারদিন পর আফ্রিকা দুই প্রতিবেশী দেশ সোমালিয়া এবং ইথিওপিয়ার মধ্য ভূখণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ মীমাংসায় মধ্যস্থতা করে চমক দেখিয়েছেন এরদোয়ান। দুটি দেশই তুরস্কের মিত্র হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, উত্তর আফ্রিকার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধে জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকারের প্রতি সামরিকসহ সব ধরনের সমর্থন দিয়ে আসছে তুরস্ক। সেখানে বিদ্রোহী জেনারেল খলিফা হাফতারের সমর্থক রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশরের বিরুদ্ধেও কার্যত তুরস্কই বিজয়ী হয়েছে, বলা যায়। এভাবে উত্তর দেশগুলোতে নানাভাবে নিজের অবস্থান সংহত করার পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি সম্পদের উপরও তুরস্কের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন এরদোয়ান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানেও তুরস্কের ভূমিকা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, কারণ ২০২১ সালের আগস্টে ইরানের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত আফগানিস্তানে তালেবান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। তুরস্ক ইরানের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার দেশ আজারবাইজানেও তুরস্ক তার উপস্থিতি সংহত করেছে। ২০২০ সালে নাগর্ণ কারবাঘ নিয়ে প্রতিবেশী আর্মেনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে আজারবাইজানকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়েছেন তুর্কির প্রেসিডেন্ট রিসেব তাইয়েব এরদোয়ান। এর মাধ্যমে কোকেশাস অঞ্চলে তুরস্ক নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তুরস্কের এই উত্থান আঞ্চলিক ক্ষমতার হিসাব নিকাশ তৈরি করেছে বড় ধরনের জটিলতার, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং তার মিত্রদের জন্য। শিয়া ইরানের সাথে সুন্নি প্রধান তুর্কির আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু দুই সুন্নি প্রধান দেশ সৌদি আরব এবং তুর্কির আধিপত্য বিস্তারের লড়াই পরিস্থিতিকে গড়ে তুলেছে জটিল। কারণ সুন্নি মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরব অনেক আগে থেকে নেতৃত্বের অবস্থানে আছে; কিন্তু দেশটির সেই অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সরকারের ইসলামপন্থী নীতি বৃহত্তর সুন্নি মুসলিম বিশ্বের ইসলামী রাজনৈতিক দল এবং জনগোষ্ঠীর কাছে তুর্কির অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং তা উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজতন্ত্রী দেশগুলোর জায়গায় তুরস্ককে বিকল্প নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
ইরান, হিজবুল্লাহ সহ মধ্যপ্রাচ্যে তার সমর্থিত প্রক্সি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিজের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে; কিন্তু তুরস্ক সেই পথে না হেঁটে স্থানীয় সুন্নি মুসলমানদের এবং ২০২১ সালে আরব বসন্তের মত জনগণের আন্দোলনগুলোর প্রতি সরাসরি সমর্থন দিয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করেছে। তুর্কির এই কৌশল হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মত দেশগুলোর আঞ্চলিক নেতৃত্বকে।
মিশরের গণ আন্দোলনে সৌরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর দেশটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। এতে ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত উপসাগরীয় রাজতন্ত্রী দেশগুলো মিশরের সামরিক অভ্যুত্থানে সমর্থন দিয়ে মুরসির সরকারের পতন ঘটায়। দেশটিতে গণতন্ত্রের পরিবর্তে আবারো ফিরে আসে সামরিক শাসন।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের শিয়াদের সমর্থন দিয়ে তেহরান থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে নিজের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করে আসছে ইরান। এই করিডোরকে ব্যবহার করে হিজবুল্লাহ সহ এই অঞ্চলে তাদের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল ও সৌদি আরবের মত বৈরি দেশগুলোকে চাপে রেখেছিল। ইরান ২০১৯ সালের মধ্যে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেন এই চারটি দেশ নিজেদের অবস্থান সংহত করে আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয় তেহরান। কিন্তু ইরানের এই কৌশল ইসরাইল এবং তুরস্কের মত দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি ছিল সিরিয়া। কিন্তু দেশটিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পাল্টা কৌশলে আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আছাদের তাসের ঘর। মাত্র ১২ দিনের ঝটিকা অভিযানে ক্ষমতা দখল করে বিদ্রোহীরা। বন্ধ হয়ে যায় সিরিয়ার মাধ্যমে লেবাননে হিজবুল্লাহর কাছে ইরানের সমরাষ্ট্র সরবরাহের রোড। এই পরিবর্তন সিরিয়ায় ইরানের দীর্ঘদিনের উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে এবং সেখানে তুর্কির ইচ্ছাতেই সবকিছু হবে। এখন সিরিয়া হাতছাড়া হওয়ায় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবে বড় ধরনের ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে। সিরিয়া এখন তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। ইরানের দুর্বল হয়ে পড়াতে যে কেবল তুর্কির উত্থান ঘটেছে, তা নয় বরং শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি, ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিও দেশটিকে উপরে উঠে আসতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দিদের উত্থান তুর্কির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কূটনীতি ও বিনিয়োগের মত অস্ত্র ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই হুমকি মোকাবেলা করার কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। তুর্কিতেও এই উত্থান এখন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে, বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সিরিয়ায় তুর্কির সহায়তার ক্ষমতার যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে তুর্কির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে, বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।